বিনিয়োগের স্বর্ণালি সময়ে জিসিসি অঞ্চলের পুঁজিবাজার

সাম্প্রতিক বছরে অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) পুঁজিবাজার।

সাম্প্রতিক বছরে অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) পুঁজিবাজার। এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এ অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ পরিকল্পনা। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ এখানকার সম্মিলিত বাজার মূলধন ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছে। যাকে অঞ্চলটিতে বিনিয়োগের জন্য ‘সোনালি যুগ’ বলে অভিহিত করছেন খাতসংশ্লিষ্ট অনেক বিশেষজ্ঞ। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরাও এ অঞ্চলকে কৌশলগত স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। খবর অ্যারাবিয়ান বিজনেস।

এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসির মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও তুরস্ক (এমইএনএটি) অঞ্চলের মার্কেট অ্যান্ড সিকিউরিটিজ সার্ভিসেস প্রধান নাবিল আলব্লোশি বলেন, ‘এ অঞ্চলে সংস্কারের গতি অসাধারণ এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণে প্রতিটি বাজার অংশীদারের কাছে শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য বার্তা রয়েছে।’

তার মতে, একাধিক কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এ অঞ্চলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রবাহ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সামনে রয়েছে অঞ্চলটির শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এখানে জীবনযাত্রা সহজ করেছে শক্তিশালী অর্থব্যবস্থা, জনসংখ্যাগত শক্তিশালী অবস্থান এবং বিশ্বের অনেক অঞ্চলের তুলনায় নিম্ন মূল্যস্ফীতি।

গত মাসে দুবাইয়ে এইচএসবিসি আয়োজন করেছে প্রধান আঞ্চলিক ইভেন্ট ‘এমইএনএটি ফিউচার ফোরাম’। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বৃহত্তম বেসরকারি বিনিয়োগকারী ও বাজার অংশগ্রহণকারীদের এ সম্মেলনে সাত শতাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন, যেখানে ছিলেন সাতটি আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিনিধিরা। বক্তাদের আলোচনায় ৩ লাখ কোটি ডলার মূল্যের মূলধন ব্যয় পরিকল্পনা, টেকসই বিনিয়োগ ও ব্লকচেইনের ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এইচএসবিসি হোল্ডিংসের এমইএনএটি ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান কারিম তান্নির ভাষ্যে, ‘আমরা এখন সোনালি যুগে বাস করছি। এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক গতির প্রতিনিধিত্ব করে যদি এমন একটি খাত বেছে নিতে হয়, তবে নির্দ্বিধায় পুঁজিবাজার, বিশেষত আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) বাজারের কথা বলব। বর্তমানে বিশ্বে আইপিওর ক্ষেত্রে অন্যতম বৃহত্তম বাজার হয়ে উঠেছে এমইএনএটি অঞ্চল, এখানে ইস্যুর পরিমাণও সবচেয়ে বেশি।’

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার পুঁজিবাজারে সৌদি আরবের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলে জানান এইচএসবিসি সৌদি আরবের সিইও ফারিস আল ঘান্নাম। দেশটির ব্যতিক্রমী পুঁজিবাজারে গত বছর ৫৭টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে।

উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘ভিশন ২০৩০’ এর কারণে সৌদি আরব বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফারিস আল ঘান্নাম বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা এখন সে রূপান্তরের বাস্তবায়ন পর্যায়ে আছি এবং এটি সম্পূর্ণ অর্থনীতিতে বিস্ময়কর ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনছে। বিশেষত বেসরকারি খাতে, যা স্বাভাবিকভাবেই পুঁজিবাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে।’

‘এমইএনএটি ফিউচার ফোরামের’ নবম বার্ষিক আসর ছিল এবার। অঞ্চলটির পুঁজিবাজারের সংস্কারের গতি এ আয়োজনে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। এতে বিনিয়োগের দৃশ্যপট আমূল বদলে গিয়ে মাত্র বছরে বাজার মূলধন বেড়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার।

প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশ্বিক মূলধন আকর্ষণের পেছনে অবদান রেখেছে বাজার কাঠামোর আধুনিকায়ন। এখানকার আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জগুলো দ্রুত অবকাঠামো উন্নত করছে। আবুধাবি সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জের (এডিএক্স) প্রধান এক্সচেঞ্জ অপারেশন অফিসার সাকার আসলান জানান, অঞ্চলটি বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের প্রবেশাধিকার বাড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি নতুন এডিএক্স গ্রুপ চালু করেছি, যেখানে এক্সচেঞ্জের সঙ্গে রয়েছে দুটি নতুন স্বাধীন সাবসিডিয়ারি এডি ক্লিয়ার ও এডি ডিপোজিটরি (এডি সিএসডি)। উন্নত প্রযুক্তি ও নতুন প্লাটফর্মের মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে আরো বেশি মানিয়ে নিয়েছি, যা এডিএক্সকে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের জন্য আরো আকর্ষণীয় করে তুলছে।’

প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বাজার অংশগ্রহণকারীদের জন্য সুবিধা বাড়াচ্ছে। সাকার আসলান বলেন, ‘নতুন প্রযুক্তি প্লাটফর্ম নতুন পরিষেবা সরবরাহ এবং ট্রেডিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বাজারের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। নতুন বাজার কাঠামো আমাদের কার্যক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতা ৪০০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে।’

এ অঞ্চলের বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে কাতার স্টক এক্সচেঞ্জ। দেশটি ‘ভিশন ২০৩০’-এর সঙ্গে সংগতি রেখে বাজার অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছে। কাতার স্টক এক্সচেঞ্জের পণ্য ও বাজার উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মহসিন মুজতাবার মতে, নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রথম ধাপ ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম এমন বড় প্রতিষ্ঠান (জাতীয় চ্যাম্পিয়ন) তৈরি করা। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দ্বিতীয় ধাপে এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়নে ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে।

সৌদি আরবের বাজার উন্নয়নও ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। এইচএসবিসি সৌদি আরবের সিইও ফারিস আল ঘান্নাম এ বিষয়ে জানান, ভিশন ২০৩০-এর প্রথম পর্যায় ছিল পরিকল্পনা, দ্বিতীয় পর্যায় ছিল বাস্তবায়ন ও তৃতীয় পর্যায় হবে ফলাফল প্রদান। এর মধ্যে বৈশ্বিক পুঁজিবাজার অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেলে সৌদি বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। এখানে সমান্তরাল বাজার নমু তৈরি হয়েছে, এ শিথিল নিয়ন্ত্রিত বিকল্প বাজার ছোট ও দ্রুতবর্ধনশীল কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত।

এইচএসবিসির এমইএনএটি অঞ্চলের মার্কেট অ্যান্ড সিকিউরিটিজ সার্ভিসেস প্রধান নাবিল আলব্লোশি জানান, সংস্কারের কারণে মূল আঞ্চলিক ইকইটি বাজারগুলো এখন বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক সূচকের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা প্রধান মিউচুয়াল ও পেনশন ফান্ডগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হয়েছে।

আরও